মানব পাচার, অবৈধ অভিবাসন, কর্মীদের দক্ষতার অভাবসহ নানা কারণে বিদেশে বাংলাদেশের শ্রমবাজার নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে আছে। নতুন শ্রমবাজার উন্মুক্ত না হলেও যেসব পুরনো শ্রমবাজার বন্ধ হয়েছে সেগুলো চালুর ব্যাপারে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়ায় কয়েক বছর ধরে হাজারো বাংলাদেশী আফ্রিকার দেশ লিবিয়া হয়ে অবৈধভাবে নৌপথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে দেশটিতে বসবাসরত অনিয়মিত শ্রমিকরা দুস্থ, অসহায় অবস্থায় জীবনযাপন করছেন। কেউ কেউ ফিরে আসছেন বাংলাদেশে। গত দুই বছরে কয়েক হাজার কর্মী লিবিয়া থেকে শাহজালাল বিমানবন্দরে নেমেছেন।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ বছরে ওমান, বাহরাইন, লিবিয়া, সুদান, মিসর, রোমানিয়া, ব্রুনাই ও মালদ্বীপে বাংলাদেশী কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে গেছে। মালয়েশিয়া সিন্ডিকেট বাণিজ্যের কারণে কর্মী নেয়া বন্ধ করেছে এক বছরের বেশি সময় ধরে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের শ্রমবাজার আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ না হলেও গত বছর জুলাই থেকে কর্মী ভিসা ইস্যু বন্ধ রেখেছে। তবে সাত বছর বন্ধ থাকার পর সম্প্রতি ইরাকের শ্রমবাজার খুলেছে। গত বছরের শুরুতে সাড়ে সাত লাখ টাকা খরচ করে লিবিয়া গিয়েছিলেন পিরোজপুরের লোকমান হোসেন। সেখানে কয়েক মাস কাজ করে ঠিকমতো বেতন পাননি। ইতালিতে গেলে ভালো বেতন ও উন্নত জীবন পাওয়া যাবে—এমন আশায় দালালের মাধ্যমে দেশটিতে অবৈধভাবে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেন লোকমান। তবে দালালরা ইতালি পাঠানোর কথা বলে তাকে বিক্রি করে দেয় আরেক চক্রের কাছে। গত বছর ৭ জুন ইতালি যাওয়ার পথে মানব পাচারকারীদের হাতে ধরা পড়েন তিনি। লিবিয়ার জুহুরঘাটে আটকে রেখে চলে নির্যাতন। হাত-পা বেঁধে লাঠি দিয়ে পেটানো অবস্থায় ভিডিও কল করা হয় লোকমানের স্ত্রীর ফোনে। মুক্তিপণ হিসেবে চাওয়া হয় ১৫ লাখ টাকা। জমিজমা বিক্রি করে ও ঋণ নিয়ে ১১ লাখ টাকা মুক্তিপণ দেয় লোকমানের পরিবার। এরপর একরকম জীবন হাতে নিয়ে চলতি বছর এপ্রিলে শূন্য হাতে দেশে ফেরেন তিনি।
লিবিয়ার ত্রিপোলিতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম কল্যাণ উইংয়ের তথ্য মতে, ২০২৩ সালের জুন থেকে এখন পর্যন্ত মোট ৭ হাজার ১৭১ জন বাংলাদেশীকে তারা দেশটির সরকারের সহায়তায় ঢাকায় ফেরত পাঠিয়েছে। এর মধ্যে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের (চার মাসে) এ পর্যন্ত প্রত্যাবাসিত বাংলাদেশীর সংখ্যা ১ হাজার ৪৬৬ জন এবং গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ হাজার ৫৩৩ জনকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়।
বিএমইটির তথ্য মতে, শ্রমবাজার বন্ধ থাকলেও চলতি বছর লিবিয়া গেছেন ১০ জন, ২০২৪ সালে গেছেন ৭৮২ জন, ২০২৩ সালে ৩৬৭ এবং ২০২২ সালে গেছেন ৩৭২ জন কর্মী। তাদের মধ্যে কয়েকজন ফিরেছেন তিউনিসিয়া থেকে।
গত ৩০ অক্টোবর লিবিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের তত্ত্বাবধানে এবং লিবিয়ার জাতীয় ঐকমত্যের সরকারের সহযোগিতায় স্বেচ্ছায় দেশে প্রত্যাবর্তনে আগ্রহী ৩১০ জন বাংলাদেশী নাগরিককে ঢাকায় ফেরত পাঠানো হয়েছে। এছাড়া গত ২৮ অক্টোবর ত্রিপোলিতে তাজুরা ডিটেনশন সেন্টারে বন্দি ২১ জন এবং মিসরাতা শহর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় বসবাসকারী দুস্থ, অসহায় ও শারীরিকভাবে অসুস্থ ১৫৩ জনসহ মোট ১৭৪ জন আগ্রহী অনিয়মিত বাংলাদেশীকে ফেরত পাঠানো হয়।
লিবিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল আবুল হাসনাত মুহাম্মদ খায়রুল বাশার এক বিবৃতিতে জানান, বিপদগ্রস্ত ও অনিয়মিত অবস্থায় থাকা অভিবাসীদের মধ্য থেকে স্বেচ্ছায় দেশে ফিরতে ইচ্ছুকদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে দূতাবাস সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও সহানুভূতির সঙ্গে কাজ করছে।
ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ প্রকাশিত পরিসংখ্যানের তথ্য মতে, ২০২৫ সালের এখন পর্যন্ত মোট ১৬ হাজার ৫৫২ জন বাংলাদেশী ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালির উপকূলে পৌঁছেছেন। এ বছর ইতালিতে পাড়ি জমানো অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গেছেন বাংলাদেশ থেকে।
রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার তাসনিম সিদ্দিকী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘লিবিয়া ইউরোপে যাওয়ার পথ। বিভিন্ন পথে বাংলাদেশী কর্মীরা দেশটিতে যান। বছর খানেক থাকার পর সুযোগ বুঝে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করেন। ইউরোপে ঢোকার মেকানিজম কঠিন হওয়ায় অনেকেই আটকা পড়ছেন, যেতে পারছেন না কিংবা অবৈধ হয়ে পড়ছেন’